শনিবার ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ - ২০:০৪
মুত্তাকিদের জীবনধারার মূলনীতি হলো সব ক্ষেত্রে ভারসাম্য ও মধ্যপন্থা

মুত্তাকিদের জীবনধারার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ভারসাম্য ও মধ্যপন্থা অবলম্বন করা। পোশাক-পরিচ্ছদ, খাদ্যাভ্যাস, দান-সদকা, ইবাদত, কর্মজীবন, পারিবারিক সম্পর্ক কিংবা পার্থিব ও আধ্যাত্মিক উপায় গ্রহণ—কোনো ক্ষেত্রেই অতিরিক্ততা বা অবহেলা কাম্য নয়। তবে ঈমান, তাকওয়া, আল্লাহর পরিচয় ও তাঁর প্রতি ভালোবাসার মতো আধ্যাত্মিক গুণাবলির ক্ষেত্রে যত বেশি অগ্রসর হওয়া যায়, ততই তা প্রশংসনীয়।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: ধর্মীয় বিশেষজ্ঞ হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন নাসের খালাজ শনিবার টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘সমত-এ খোদা’-য় আমিরুল মুমিনীন হযরত আলী (আ.)-এর ‘খুতবায়ে মুত্তাকিন’-এ মুত্তাকিদের দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করেন।

তিনি বলেন, আমিরুল মুমিনীন হযরত আলী (আ.) মুত্তাকিদের জীবনধারা সম্পর্কে বলেছেন,

 وَ مَلْبَسُهُمُ الاقْتِصادُ

“তাদের পরিধেয় হলো পরিমিতি ও ভারসাম্য।”

তিনি ব্যাখ্যা করেন, ‘ইকতিসাদ’ শব্দটি ‘কাসদ’ ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ মধ্যপন্থা ও ভারসাম্য বজায় রাখা। বাহ্যিক অর্থে, এ বক্তব্যের অর্থ হলো—মুত্তাকিদের পোশাক-পরিচ্ছদে পরিমিতি ও ভারসাম্য থাকে।

পোশাক হবে পরিমিত, সৌন্দর্যবর্ধক ও দোষ-ত্রুটি আড়ালকারী
হুজ্জাতুল ইসলাম খালাজ বলেন, পবিত্র কুরআনে ‘পোশাক’-এর ধারণা শুধু শরীরের পরিধেয় বস্ত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আল্লাহ রাতকে পোশাক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক প্রসঙ্গে তিনি বলেন,

 هُنَّ لِباسٌ لَکُمْ وَ أَنْتُمْ لِباسٌ لَهُنَّ

“তারা তোমাদের পোশাক এবং তোমরা তাদের পোশাক।”

এছাড়া সূরা আল-আ‘রাফে ‘তাকওয়ার পোশাক’-এর কথা বলা হয়েছে। তাই পোশাকের বৈশিষ্ট্যকে দাম্পত্য সম্পর্ক, পরিবার ও তাকওয়ার ক্ষেত্রেও বিবেচনা করা যায়।

তিনি বলেন, পোশাকের নকশা, রং ও উপাদান ব্যক্তির মর্যাদা ও পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত। একইভাবে জীবনসঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রেও স্বামী-স্ত্রীর চিন্তাধারা, সংস্কৃতি ও ব্যক্তিত্বের মধ্যে প্রয়োজনীয় সামঞ্জস্য থাকা গুরুত্বপূর্ণ।

পোশাক মানুষের সৌন্দর্য বৃদ্ধি ও প্রশান্তি দেওয়ার মাধ্যম। একইভাবে স্বামী-স্ত্রীরও একে অপরের জন্য সৌন্দর্য, প্রশান্তি ও স্বস্তির কারণ হওয়া উচিত।

তিনি আরও বলেন, পোশাক যেমন মানুষের দোষ-ত্রুটি আড়াল করে, তেমনি স্বামী-স্ত্রীরও একে অপরের ত্রুটি গোপন রাখা এবং দুর্বলতা প্রকাশ না করা উচিত। পোশাক যেমন মানুষকে শীত ও গরম থেকে রক্ষা করে, তেমনি স্বামী-স্ত্রীরও জীবনের কঠিন সময় ও নানা উত্থান-পতনে একে অপরের আশ্রয় ও সহায়ক হওয়া উচিত।

তিনি বলেন, পোশাক মানুষের জন্য অপমান বা লজ্জার কারণ হওয়া উচিত নয়; বরং তা পরিচ্ছন্ন ও যত্নসহকারে ব্যবহৃত হওয়া উচিত। পারিবারিক জীবনেও স্বামী-স্ত্রীর নিজেদের ও সন্তানদের ব্যাপারে সতর্ক থাকা এবং তাদের পাপ ও নৈতিক ক্ষতির সংস্পর্শ থেকে রক্ষা করা জরুরি।

তিনি সূরা আল-আ‘রাফের ২৬ নম্বর আয়াত উল্লেখ করে বলেন,

 یَا بَنِی آدَمَ قَدْ أَنْزَلْنَا عَلَیْکُمْ لِبَاسًا یُوَارِی سَوْآتِکُمْ وَ رِیشًا

“হে আদমসন্তান! আমি তোমাদের জন্য এমন পোশাক দিয়েছি, যা তোমাদের লজ্জাস্থান আবৃত করে এবং সৌন্দর্যও বৃদ্ধি করে।”

এরপর আল্লাহ তাকওয়ার পোশাককে সর্বোত্তম বলে উল্লেখ করেছেন এবং বাহ্যিক পোশাককেও তাঁর নিদর্শনগুলোর অন্যতম হিসেবে তুলে ধরেছেন।

লোক দেখানো ও অহংকারের পোশাক মুত্তাকিদের জীবনধারার পরিপন্থী
হুজ্জাতুল ইসলাম খালাজ বলেন, পোশাক যেন খ্যাতি অর্জন, লোকদেখানো, অহংকার, অপচয় কিংবা কুপ্রবৃত্তি উসকে দেওয়ার মাধ্যম না হয়। এখানে শুধু পোশাকের দাম কম না বেশি—সেটিই মূল বিষয় নয়। কেউ নিজের সামাজিক অবস্থান ও প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দামী পোশাক পরতে পারেন; কিন্তু উদ্দেশ্য যদি লোকদেখানো বা খ্যাতি অর্জন না হয়, তাহলে শুধু পোশাকের মূল্য বেশি হওয়ার কারণে তাকে তাকওয়াহীন বলা যায় না।

তিনি সতর্ক করে বলেন, কারও দামী পোশাক দেখেই তাকে পরহেজগারহীন মনে করা উচিত নয়। তাড়াহুড়ো করে মানুষের বিচার করা থেকে বিরত থাকতে হবে। কারণ ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব, পেশা ও সামাজিক অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তার পোশাকের ধরন ভিন্ন হতে পারে।

তিনি وَ مَلْبَسُهُمُ الاقْتِصاد বাক্যটির দুটি ব্যাখ্যার কথা উল্লেখ করেন।

প্রথম ব্যাখ্যা হলো, এখানে বাহ্যিক পোশাকে ভারসাম্যের কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ মুত্তাকিরা অতিরিক্ত জাঁকজমকপূর্ণ ও অত্যন্ত ব্যয়বহুল পোশাক পরবেন না, আবার এমন অনুপযুক্ত পোশাকও পরবেন না, যা তাদের হেয় বা বিব্রত করে। অনেক মহান আলেমের জীবনেও দেখা যায়, তাঁদের পোশাক ছিল পরিচ্ছন্ন, সুন্দর ও পরিপাটি; তবে তাঁরা বিলাসিতা ও অত্যন্ত ব্যয়বহুল পোশাকের পেছনে ছুটতেন না।

দ্বিতীয় ব্যাখ্যাটি আরও ব্যাপক। এখানে শুধু বাহ্যিক পোশাক নয়; বরং ভারসাম্যই মুত্তাকিদের জীবনধারার বৈশিষ্ট্য। অর্থাৎ খাদ্যগ্রহণ, পানাহার, দান-সদকা, ইবাদত, কর্মজীবন, পারিবারিক সম্পর্ক এবং জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও মুমিনকে মধ্যপন্থা অবলম্বন করতে হবে।

খাদ্য, দান, ইবাদত ও কর্মজীবনেও চাই ভারসাম্য

খাদ্যাভ্যাসে ভারসাম্যের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেছেন,

 کُلُوا وَاشْرَبُوا وَلَا تُسْرِفُوا

“তোমরা খাও ও পান করো, কিন্তু অপচয় করো না।”

অতএব, খাবার ও পানীয় গ্রহণে পরিমিতি বজায় রাখতে হবে। অতিভোজন যেমন কাম্য নয়, তেমনি এতটা কম খাওয়াও উচিত নয়, যাতে দৈনন্দিন দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়।

দান-সদকার ক্ষেত্রেও ভারসাম্য জরুরি। কৃপণতা যেমন অনুচিত, তেমনি এমনভাবে দান করাও উচিত নয়, যার ফলে নিজের পরিবার সমস্যায় পড়ে। কুরআন একদিকে কৃপণতার নিন্দা করেছে, অন্যদিকে সম্পূর্ণভাবে হাত খুলে দিয়ে অপচয় করতেও নিষেধ করেছে। তাই দানের ক্ষেত্রেও মধ্যপন্থা অবলম্বন করতে হবে।

ইবাদতের ক্ষেত্রেও মানুষের শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। নামাজ, রোজা, কুরআন তিলাওয়াত ও অন্যান্য ইবাদত এমনভাবে করা উচিত, যাতে সেগুলো নিয়মিত ও যথাযথভাবে চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়। নিজের সামর্থ্য বিবেচনা না করে অতিরিক্ত ইবাদতে লিপ্ত হওয়াও ক্ষতির কারণ হতে পারে।

কর্মজীবন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। জীবিকা নির্বাহের জন্য পরিশ্রম করতে হবে; তবে কাজে এমনভাবে ডুবে যাওয়া উচিত নয় যে পরিবার, সন্তান, ইবাদত ও অন্যান্য দায়িত্ব পালনের জন্য সময়ই অবশিষ্ট থাকে না। মুত্তাকিরা উপার্জন ও কর্মজীবনেও ভারসাম্য বজায় রাখেন।

বস্তুগত ও আধ্যাত্মিক উপায়ের মধ্যে সমন্বয়
হুজ্জাতুল ইসলাম খালাজ বলেন, ভারসাম্যের আরেকটি দিক হলো বাহ্যিক ও আধ্যাত্মিক—উভয় ধরনের উপায়ের প্রতি একসঙ্গে মনোযোগ দেওয়া।

কিছু মানুষ শুধু বস্তুগত কারণের ওপর নির্ভর করেন এবং দোয়া, তাওয়াক্কুল, তাওয়াসসুল, সদকা ও আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার মতো আধ্যাত্মিক বিষয়গুলো উপেক্ষা করেন। আবার কেউ কেউ শুধু দোয়া ও তাওয়াক্কুলের ওপর নির্ভর করে বাস্তব প্রচেষ্টা ও নিজেদের দায়িত্ব থেকে দূরে থাকেন। মুত্তাকিদের জীবনধারা হলো—এই দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় সাধন করা।

তিনি সূরা ইউসুফের ৬৭ নম্বর আয়াতের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, হযরত ইয়াকুব (আ.) তাঁর সন্তানদের মিসরে প্রবেশের সময় বিভিন্ন দরজা দিয়ে প্রবেশ করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন,

 وَ عَلَیْهِ تَوَکَّلْتُ “আমি তাঁর ওপরই ভরসা করেছি।”

অর্থাৎ মানুষের উচিত বাস্তব ও বাহ্যিক উপায় অবলম্বন করার পাশাপাশি আল্লাহর ওপরও তাওয়াক্কুল করা।

পার্থিব বিষয়ে ভারসাম্য, আধ্যাত্মিক গুণে সর্বোচ্চ উৎকর্ষ
আলোচনার শেষাংশে এই ধর্মীয় বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘খাইরুল উমুরি আওসাতুহা’—‘সব বিষয়ে মধ্যপন্থাই উত্তম’—এর অর্থ এই নয় যে, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই মাঝামাঝি অবস্থানে থাকতে হবে।

পার্থিব বিষয় ও জীবনযাপনের ক্ষেত্রে ভারসাম্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি। কিন্তু ঈমান, তাকওয়া, আল্লাহর পরিচয়, আত্মপরিচয়, আল্লাহ ও তাঁর ওলিদের প্রতি ভালোবাসা, আল্লাহর নৈকট্য এবং ন্যায়বিচারের মতো আধ্যাত্মিক গুণাবলির ক্ষেত্রে মানুষ যত উচ্চতর স্তরে পৌঁছাতে পারবে, ততই তা উত্তম।

তিনি বলেন, আল্লাহর পরিচয় ও আত্মপরিচয়ের ক্ষেত্রে মানুষের কোনো ‘মধ্যম’ স্তরে থেমে থাকা উচিত নয়। ঈমান ও ভালোবাসার ক্ষেত্রেও কুরআন মুমিনদের দৃঢ় ঈমান ও গভীর ভালোবাসার কথা তুলে ধরেছে। একইভাবে ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রেও দুজন ব্যক্তি ন্যায়পরায়ণ হলে যে ব্যক্তি অধিক ন্যায়পরায়ণ, তার মর্যাদা বেশি।

হুজ্জাতুল ইসলাম খালাজ জোর দিয়ে বলেন, মানুষের জীবনধারায় ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত থাকতে হবে। তবে এই নীতিকে আধ্যাত্মিক উৎকর্ষ সীমিত করার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা যাবে না। মুত্তাকি ব্যক্তি পার্থিব জীবনযাপনে অতিরিক্ততা ও অবহেলা থেকে দূরে থাকেন; কিন্তু ঈমান, তাকওয়া, জ্ঞান, ভালোবাসা, ন্যায়বিচার ও আল্লাহর নৈকট্যের ক্ষেত্রে তিনি সর্বদা আরও উচ্চতর স্তরে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha